নজরুলের সৃষ্টিতে সাম্যবাদী চেতনা

মোঃ নূরুল আমিন

এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতূর্য। এই আলোকিত চরণের মধ্যেই গোটা নজরুল সাহিত্যের বীজ প্রোথিত। দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানব মুক্তির প্রত্যয়ে তার দ্রোহসঞ্জাত অকুণ্ঠ উচ্চারণের পশ্চাতে ছিলো মানুষের প্রতি প্রগাড় ভালোবাসা। প্রেম ও বিদ্রোহের এই সহাবস্থানে পরিপুষ্ট হয়েছে তার সাম্যবাদী চেতনা। সে চেতনারই উদগার ঘটেছে তাঁর সৃষ্টির পরতে পরতে। তাইতো নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ধনী-নির্ধন ব্যবধান বিস্মৃত হয়ে লীন হয়েছে তাঁর সৃষ্টিকর্মে। বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে বাংলা সাহিত্যাকাশে নজরুলের আবির্ভাব।

আজন্ম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন তাঁর সৃষ্টি পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ালেও ব্যক্তি জীবনকে সুস্থির হতে দেয়নি আদৌ। রক্তমাখা চলার পথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার অনেকটাই তাঁর সৃষ্টিতে ছায়া ফেলেছে। সে পথ পরিক্রমায় দৃষ্ট সামাজিক বৈষম্য, দুর্বলের উপর সবলের পীড়ন, অত্যাচার, অনাচার, অন্ধত্ব, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, লৈঙ্গিক অসমতা, ঔপনিবেশিক ভেদনীতি তাঁকে ব্যথিত, মর্মাহত, ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ করেছে। আর বিক্ষুব্ধ চিত্তের শৈল্পিক প্রকাশ বিদ্রোহের অগ্নিঝরা বাণী হয়ে প্রবল করাঘাত করেছে সামাজিক অসাম্যের প্রাকারে। আবার মানবপ্রেমের অমেয় সুধা শান্ত রস সিঞ্চিত করে বিদ্রোহী সত্তায় যে পেলব প্রলেপ দিয়েছে সেটাই তার সৃজনে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। এজন্য বলা যায় ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য’ এ তাঁর অন্তর্গত সত্তারই অনিবার্য প্রকাশ।

তাঁর সৃষ্টিতে প্রেম বা বিদ্রোহ এসেছে মানবপ্রেম ও মানবমুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা থেকে। অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন, নিষ্পেষণ, বৈষম্যমুক্ত মানবিক সত্তা, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের অভিপ্সায় তার কাব্য আলোকাভিসারে নিমজ্জমান। মানুষের প্রতি অসীম দরদ ও গভীর ভালোবাসা না থাকলে সৃষ্টির প্রকাশ এত স্বচ্ছ ও স্বতঃস্ফূর্ত হয় না।
সাম্যবাদী নজরুল মহত্তর গুণে সমতার গান গেয়ে সবার উপরে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। এজন্য অকুণ্ঠ চিত্তে তিনি ঘোষণা করেছেন-

‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান, নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সবদেশে সবকালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

মানুষকে তার সৃষ্টির কেন্দ্রে প্রতিস্থাপন করে প্রেম ও সৌন্দর্যের সৌধ বিনির্মাণে তিনি মেতে উঠেছেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। ব্রিটিশ প্রণীত ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি সমাজদেহে যে অসমতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল; সে রাজরোগ শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে বরাবর উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন কবি তার লেখনিতে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে বৃহত্তর ঐক্যের প্রত্যাশায় হিন্দু-মুসলিম মিলিত শক্তির জাগরণ কামনা করে বিভাজনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম,’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারি বল, মানুষ ডুবছে সন্তান মোর মার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিতে, পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীনতার বর্ণিল আনন্দে মেতে উঠতে তিনি সম্প্রদায়গত বিভেদ ভুলে সম্মিলিত শক্তির উদ্বোধন কামনা করেন। ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়নমনি, হিন্দু তার জান।’

মানুষে মানুষে বিভাজনের দেওয়াল তুলে ফায়দা হাসিলের ব্যবসায়ীদের প্রতি তাঁর রোষ ঝরেছে নানান মাত্রায়। ১৯৪১ সালের একটি অভিভাষণে তিনি বলেছেন ‘কেউ বলে আমার বাণী যবন, কেউ বলে কাফের। আমি বলি, ও দুটার কোনোটাই না। আমি কেবল হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাত মেলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে ওদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি। হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ।

মনুষ্য সভ্যতায় মানুষকে পরম মমতায় ভালোবেসে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন বলেই ধর্মের নামে মানুষ হত্যাসহ সমস্ত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন সজ্ঞানে। মানুষের মনে আঘাত দিলে সে আঘাত লাগে কাবার গায়। তাইতো তিনি উচ্চারণ করেন কাব্যিক সুষমায় ‘শুন হে মানুষ ভাই, এ হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।’ কারণ তিনি মনে করেন মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর কবিতার চরণে –

‘পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’

পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে জাতির জীবনে স্বাধীনতা আনতে নজরুল সাহিত্যের সক্রিয়তা প্রশ্নাতীত। এই সক্রিয়তাই তাকে বিদ্রোহের পথে রসদ জোগায়। নজরুলের গান, কবিতা ও প্রবন্ধে সে বিপ্লবাত্মক সুর ব্যঞ্জিত হয়েছে দ্রোহের ভাষায়। কিছু আলোকিত চরণে তারই প্রতিফলন লক্ষণীয়-

‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল পরার ছল।
এই শিকল পরে শিকল তোদের করবো যে বিকল।’
‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার!’
‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণি তল, অরুণ প্রাতের তরুণ দল চলরে চলরে চল।’
‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণভেদী।’

একদিকে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ কবিকে করেছে ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন স্পর্ধিত চেতনায়। অন্যদিকে এদেশীয় লুম্পেন, লুণ্ঠক ধনিক শ্রেণির অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে হয়েছেন খড়গহস্ত। এভাবে সামাজিক বৈষম্যের মূলে তিনি নির্মমভাবে কুঠারাঘাত করেছেন। মানুষ কবিতায় মসজিদের মোল্লা আর মন্দিরের পুরোহিতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভেকধারী ধর্মাচারীর হৃদয়হীনতা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে ক্রুশবিদ্ধ করেছেন।

নারী-পুরুষের বায়োলজিক্যাল ভিন্নতা পরস্পরের সহায়ক। এটা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের শর্ত বা পরিমাপক না। সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় একে অন্যের পরিপূরক। সেই অর্থে উৎকৃষ্ট, নিকৃষ্ট বা কর্তৃত্ব বা অধীন শব্দগুলো সমাজ স্বাস্থ্যের জন্য সুখকর নয়। নারী-পুরুষ প্রতিপক্ষ না হয়ে পরস্পর সহযোগী হলেই সভ্যতার উন্নয়ন বরং ত্বরান্বিত হয়। সে কথাই কবি ব্যক্ত করেন অনুপম মহিমায়-

‘সাম্যের গান গাই আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’

লৈঙ্গিক বৈষম্য নিরসন করে কবি চান ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে। তারই প্রতিধ্বনি উল্লিখিত নারী কবিতার প্রতি ছত্রে।

সাম্যবাদী কবিতায় প্রস্ফুটিত অসাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির এ সুর নজরুল সাহিত্যে আকস্মিক নয়; তাঁর সাহিত্যাদর্শের একটা বড়ো জায়গা জুড়ে, তাঁর মনোভূমে এ সুরের ক্রম প্রসার দুর্লক্ষ নয়। এই বিভেদ সমাজদেহের রুগ্নতার লক্ষণ। এটি ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা আরোপিত ও সৃষ্ট এবং রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় পুষ্ট হওয়ায় কবি-এর থেকে মুক্তির প্রত্যয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঊর্ধ্বে মানবতার উদ্বোধন কামনা করেছেন।‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’ দারিদ্র্যকে বন্দিত করলেও স্বাগত জানাননি কবি। কারণ অভাব-ক্ষুধা-পীড়নে জর্জর মনুষ্যত্বের অবমাননায় তিনি শিউরে উঠেছেন।

কৃষক, শ্রমিক, মুটে, মজুর, জেলে, মাঝি সহ নিম্ন বৃত্তের পেশাজীবী মানুষ আর সামাজিক নিপীড়নে জেরবার প্রান্তিক গণমানুষের সমন্বিত স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় নজরুলের সাম্যবাদী, সর্বহারা, ভাঙার গান কাব্যের বিভিন্ন কবিতায়, গানে ও প্রবন্ধে। সাহিত্যচর্চা তাই তাঁর কাছে নিছক বিলাসিতা হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে মানবমুক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের অনিবার্য হাতিয়ার আর আশ্রয়। পুঁজিবাদে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হয়। সম্পত্তি পোলারাইজেশনের ফলে সে ব্যবধান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজ বা রাষ্ট্র দেহে বৈষম্যের দেওয়াল আরও পোক্ত হয়। সেই শক্ত অমানবিক দেওয়ালে সজোরে আঘাত করে সমূলে উৎপাটন তাঁর সাহিত্যের অন্যতম মৌল বৈশিষ্ট্য।

বৈষম্যমুক্ত সমতাভিত্তিক আলোকিত সমাজ তাঁর মোক্ষ, মানব কল্যাণ বা মানবমুক্তি তাঁর পাথেয় হলেও কোনো নির্দিষ্ট দার্শনিক তত্ত্ব বা মতাদর্শের আলোকে তিনি ব্রিটিশ বিরোধিতা বা সাম্য সমাজ নির্মাণে ব্রতী হননি। গান্ধীর অহিংস নীতি যেমন তাঁকে আকৃষ্ট করেছে, তেমনি বা তার চেয়েও বেশি সুভাস বসুর সশস্ত্র আজাদির পথ তাঁকে প্রভাবিত করেছে।

সকল সংকীর্ণ চিন্তা ও স্বার্থবুদ্ধির ঊর্ধ্বের এই পথই মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ, সমতার পথ।। তাই সত্য-সুন্দর আদিগন্ত ডানা মেলে নজরুল সাহিত্যকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য, সাম্যবাদী চেতনার মহিমা যে স্বাতন্ত্র্যে প্রোজ্জ্বল।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন